ত্রিপক্ষ চুক্তি এবং বঙ্গ-ভঙ্গের শিলান্যাস
ডাঃ মুকুন্দ মজুমদার
গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর সামনে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো শিলিগুড়ির নিকট পিন্টেল ভিলেজে। চুক্তিতে নেপালিদের মহামঙ্গল হবে এই কথাই আছে, তবে বাঙালির কি হবে সেই বিষয়ের কোন উল্লেখ নাই। পাহাড়ে ৭০ হাজার বাঙালি, ৫০ হাজার মাড়ওয়ারই, বিহারী, এবং ৬০ হাজার লেপচা-ভূটিয়া আছে। তাদের প্রতি ন্যায় বিচার, নিরাপত্তা, ভাষা সংস্কৃতিসহ জাতি সত্ত্বার অধিকার ও আত্ম-পরিচয়ের কি হবে তার কোন উল্লেখ নাই।
গোর্খাল্যান্ডের দাবী ছেড়েছেন এমন মুচলেকা বিমল গুরুং এর নিকট থেকে আদায় করাই হয়নি। বরং দাবী করতে পারবেন এমন ভাবে চুক্তিতে ‘গোর্খাল্যান্ড দাবী’ নথিভুক্ত বা রেকর্ড করা আছে। তাই চুক্তির পরমূহুর্তে কালবিলম্ব না করে, মূখ্যমন্ত্রী শিলিগুড়ি থাকতেই, মোর্চা নেতা বিমল গুরুং একই সরকারি মঞ্চ থেকে তরাই- ডুয়ার্স সহ গোর্খাল্যান্ড দাবী করলেন। স্পষ্টতঃ মুখ্যমন্ত্রীর ‘বাংলাভাগ হবে না’ কথা চাপা দিয়ে বিমল গুরুং কোন সৌজন্যের তোয়াক্কা না করে, গোর্খাল্যান্ড দাবী আরও জোরদার করলেন। অর্থাৎ উন্নয়নের আর্থিক প্যাকেজ দিয়ে এবং ‘নেপালি স্বায়ত্ব-শাসন- জিটিএ(GTA- Gorkhaland Territorial Administration)’ এর ব্যাপক ক্ষমতা হাতে তুলে দিলেও তারা গোর্খাল্যান্ড দাবী কিছুতেই ছাড়েননি।
নেপালিরা সত্য গোপন করেনি। করেছে বাঙালিরা।
মুখে ‘বাংলা ভাগ হতে দেবো না’ বলে অতি গোপনে এবং অতি তাড়াহুড়া করে, জনগণকে অন্ধকারে রেখে এমনকি মন্ত্রীসভা, বিধানসভা, বিরোধীদল বা বুদ্ধিজীবিদের কিছুই না জানিয়ে এই চুক্তি।
গোর্খাল্যান্ড দাবী স্বীকার করে ‘গোর্খালয়ান্ড টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ গঠন- গোর্খাল্যান্ডেরই ভিত্তি স্থাপন এবং বঙ্গ-ভঙ্গের শিলান্যাস। যেমন আসাম ভেঙে মিজোরাম, প্রভৃতি রাজ্য গঠন হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ নাম মুছে আগেই সমস্ত সাইন বোর্ডে গোর্খাল্যান্ড লেখা আছে; এখন দার্জিলিং মুছে ‘গোর্খাল্যান্ড’ হল। তার অর্থ পিতার নাম মুছে দিলো। বাঙালির পিতৃ-পুরুষদের সৃষ্ট বাঙালির শহর দার্জিলিং বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ, বাঙালীর মাতৃভূমি। তবুও বলা হচ্ছে নামে কিছু আসেযায় না।
মা-মাটি দার্জিলিং এবং বাঙালির আত্ম-পরিচয় বিসর্জন দিয়ে বাঙালির নিজভূমিতেই বহিরাগত বিদেশী নেপালির আত্ম-পরিচয় চুক্তিতে নথিভূক্ত করে অদুরদর্শী নেতৃত্ব বাঙালিকে আত্ম-হত্যার পথে ঠেলে দিলো অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে।
তরাই, ডুয়ার্স, শিলিগুড়িকে জিটিএ অন্তর্ভূক্ত করার জন্য এক অভুতপূর্ব্ব চক্রান্ত করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কাজ হচ্ছে- বাংলার সংখ্যালঘু নেপালিদের সংখ্যা-গরিষ্ঠতা খুঁজে বার করে- সেই এলাকাগুলি জিটিএ তে ঢোকানোর সুপারিশ করা। সংখ্যালঘুর সংখ্যা-গরিষ্ঠতা নির্ণয়তত্ব পশ্চিমবঙ্গের বুকে ছুরি মারার চক্রান্তও। এই নীতি মেনে স্বায়ত্ব-শাসন বা পৃথক রাজ্য দিলে, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কলকাতা, আসানসোল, বাঁকুড়া সবই চলে যাবে।
মোর্চা সমতলে মিটিং মিছিলের অনুমতি নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে এবং টাকা খরচ করে তরাই ডুয়ার্স ও শিলিগুড়ি দখল করার চেষ্টা করছে ও করবে। আগের সরকার DGHC এলাকার বাইরে সমতলে মোর্চাকে মিটিং-মিছিল করার অনুমতি দিত না। এখন অবাধে সমতলে ভীতিপ্রদর্শন, উন্নয়নের স্বপ্ন ও অর্থের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেপালি ছাড়াও অনেপালিদের জিটিএ তে ঢোকাতে চেষ্টা করবে।
বছরে কেন্দ্রের ২০০ কোটি টাকা তিন বছরে ৬০০ কোটি এবং রাজ্য সরকার প্রদত্ত সমপরিমাণ বিপুল অর্থে মোর্চার সংগঠন মজবুত করা, জি এল পি র শক্তি বৃদ্ধি এবং বেশী অংশ সমতলে জমি, বাড়ী, ফ্ল্যাট কিনে বা ভাড়া নিয়ে নেপালির জমি ও সংখ্যাবৃদ্ধি করে নূতন জমি বা এলাকা দখল করা। তাতে ডুয়ার্স, তরাই শিলিগুড়ি এখনই যাবার পথে।
আর চুক্তি কার সার্থে? নেপালিদের অর্ধেকের বেশিইতো বিদেশী- ভারত সরকারের ১৯৮৮ সালের ২৩ আগস্ট গেজেট নোটিশ অনুসারে। অবশ্য আইন মানা হলে।
১৯৫০ ভারত-নেপাল চুক্তির ৭ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে বিদেশী নেপালি ঢোকা বন্ধ করা এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিদেশী নেপালি সনাক্ত করার বিষয় চুক্তিতে কিছুই নাই। কারণ নেপালিরা অনেকেই যে বিদেশী মুখ্যমন্ত্রী তা মানেন না।
নেপালিদের সাফল্যে উৎসাহিত আদিবাসী সহ সব সংখ্যালঘুর একই স্বায়ত্ব-শাসন ও পৃথক রাজ্যের দাবীতে পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে শেষ হবে। সেইজন্য প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও ইন্দিরা গান্ধী এবং লোক সভা সিপিএমের আনিত নেপালি স্বায়াত্ব-শাসন প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেন। তাঁদের মতে ‘আজ স্বায়ত্ব-শাসন, কাল পৃথক রাজ্য তা কে ঠেকাবে?’
নেপালি, বিহারি, আদিবাসী সকলেই বাংলার মধ্যে বাঙালি। কোন স্বায়ত্ব-শাসন কাউকেই নয়। সব জেলাতেই জেলা কাউঞ্ছিলের মাধ্যমে উন্নয়ন হোক। আর যদি দার্জিলিং-এ ১০ লক্ষ নেপালিদের জন্য স্বায়ত্ব শাসন এর দাবী ওঠে, তাহলে ঝাড়খণ্ড-এর দেড় কোটি বাঙালি, আসামের দেড় কোটি বাঙালি এবং অন্যত্র যেখানে ১০ লক্ষের বেশি বাঙালি আছে, সেখানে স্বায়ত্ব শাসন এর দাবী ওঠে না কেন?
২০০৫ সাল থেকে বাংলা ও বাংলা ভাষা বাঁচাও কমিটি নেপালি স্বায়ত্ব-শাসন দেবার বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করে চলেছে। কালক্রমে সেই আন্দোলন সিপিএম হটাও আন্দোলনে পরিণত হয়ে নতুন সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে ব্যাপক সাহায্য করেছে। কিন্তু নূতন সরকার কংগ্রেসের নীতি ত্যাগ করে, সিপিএম এর সংখ্যালঘু তোষন-নীতি ও নেপালি স্বায়ত্ব-শাসন-নীতি অনুসরণ করে বাংলা ও বাঙালির সর্বনাশ করতে ত্রিপক্ষ চুক্তি করলেন কেন?
কার স্বার্থে?